সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

একটা বট গাছের মৃত্যু




আমরা যারা একুশ শতকে জন্মেছি, তারা বিশেষ মাঠ, গাছ পালা দেখিনি। দেখলেও দেখার সীমানাটা বেধে দিচ্ছিল এক শ্রেণীর উঠতি প্রমোটারেরা। এখনকার বাচ্চাদের দের কাছে মাঠটা আবার কল্প বিজ্ঞানের কাহিনী। মাঠ, গাছ, আকাশ যখন সবই আসতে আসতে ন্যাচারাল হেরিটেজ হয়ে যাচ্ছে তখন আমরা হওয়া খেতে রুফটপ ক্যাফেতে আসছি, সাতশো টাকার কফি খেয়ে মনে করছি চোদ্দশো টাকার প্রাণ পেলাম। এমন সময় আমাদের পাড়ায় কিছু গাছ দাড়িয়ে থাকে, যাদের বয়েসের গাছ পাথর নেই। কোনো প্রোমোটারও কাটতে আসছে না। আসলে অত ছোটো জায়গার তো মালিক হয় না। আমার পাড়ায় এমন একটা গাছ কে ছোট থেকে দেখছি। রিক্সার স্ট্যান্ডের ছাওয়া ও, সাথে লাগোয়া ছোট্ট একটা মন্দির আর ঢাউস আবর্জনা। এ পাড়ার কত প্রজন্ম গাছ টাকে দেখছে তার হিসেব আমি জানিনা, তবে বুঝতে পারি বটগাছ টাও আমাদের দেখছে। এটাও জানি, ও বুড়িয়ে গেলে পৌরসভাও ওকে কাটবে না বরং ওর চারপাশের বেদী তে অতিরিক্ত সিমেন্ট আটকে দেয়ে যাবে। মোটা গাথনি, যাতে আর না বাড়তে পারে।

আমি ওই গাছ টাকে এখনও মরতে দেখিনি। তবে মরতে দেখেছি অন্য একটা বট গাছ কে। তার সাথে ফুরিয়ে যেতে দেখেছি একটা শহর, একটা প্রজন্ম কে..

ঠিক দশ বছর আগে এরমই একটা শ্রাবণের বিকেল, হালকা বৃষ্টি পড়ছে। বাঙালির পছন্দের শব্দ নিম্নচাপ। তার সাথেই আমার সামনে দেখলাম, আমার বট গাছ চলে যাচ্ছে। মৃত্যু আমায় এখনও ঠিক দাগ কাটে না। চট করে কাঁদায়ও না। তবে বয়েস বাড়লে অনুভব করি, এখন যেমন করছি। 

মৃত্যু মানুষের মধ্যে যেমন জন্ম দেয় সংস্কারের, স্মৃতির, শিকড়ের, তেমনই কিছু কিছু মৃত্যু কেরে নেয় একটা শহরকে, গোটা প্রজন্মের ইতিহাস কে। ঠাম্মার মৃত্যুটা আমার কাছে তেমনই, হওয়া আফিসের ভুল খবরের মতো। বৃষ্টি আসবেনা বলেও দুম করে চলে এসছে। আরও তো কিছু দিন থাকা যেত, আমাদের দম বন্ধ করা এক কামরার ঘর গুলোতে, অনন্ত আপোষের সাথে। সেটা তিনি করেন নি।  আমাদের বেড়ে ওঠা, ভালো থাকা না দেখেই আচমকা চলে যাওয়া। এতদিন পর বুঝতে পারি, ঠাম্মাই ছিলো আমার কাছে একটা আস্ত শহরের শেষের দিন গুলো। ক্ষয়ে যাওয়া কলকাতা। পাওয়ার কমে আসা ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো, পেট্রোলের গন্ধ, কালো হলুদের পি ডাব্লিউ ডি র ডিভাইডার, সবুজ হলুদের স্ট্রীট ফেন্সিং, গাছের গায়ের লাল সাদা রং, পাড়া জোড়া লাল পতাকা.. সমস্ত টাই ওঁর মৃত্যুর সাথে ফুরিয়ে গেছে। যেমন মানিকতলা পোষ্ট অফিসের সামনে দাড়িয়ে, শেষ কত বছর আগে জনতা রেস্টুরেন্টের তেলচিটে কেবিনের পর্দা টাকে উড়তে দেখেছি, ঠিক মনে পরে না। হলদে কলকাতার মতই আমার শৈশব নিয়ে চলে যাওয়ার দশ বছর আজ।

ছোটোবেলা থেকে ঠাম্মাই আমাকে শিখিয়ে ছিলো ঈশ্বর বিশ্বাস। স্নান করে দুপুরের সমস্ত কাজ সেরে যখন আহ্নিক করতে বসতেন, আমি তখন ওঁকে এগিয়ে দিতাম ঠাকুরের জামা, বেছে দিতাম ফুল আর প্রশ্ন করতাম। ওখানে তুলসী পাতা দাও কেন? এর পর কি এটাই? আমায় তিলক পড়াবে না?.. উনি আমায় প্রত্যেকটা উত্তর দিত মায়া মায়া গলায়। এখন যখন ধর্ম, ঈশ্বর কোনোটাতেই বিশ্বাস করে উঠতে পারি না, তখন ওঁর গলায় আমার ডাকনাম গুলো মনে পড়ে। যেগুলো শ্রীকৃষ্ণের অষ্টত্তরো শতনাম থেকে বেছে বেছে আমায় ডাকতো। ওই ডাক গুলোতে আমি আর কাউকে কোনো দিন ডাকতে শুনিনি। তবুও ওর ভক্তি কে আমি এখনও বিশ্বাস করি। যে দিনগুলোতে আমি ঠাম্মার সাথে নাম সংকীর্তন শুনতে যেতাম, চুপটি করে আমায় কোলে নিয়ে কখনও কখনও ওঁকে ওখানে কাঁদতে দেখেছি বিহ্বল হয়ে। তবে ওখানেই, আর ঠাম্মা কোথাও কাঁদত না। হয়তো কোনোদিনই কাঁদেনি। পরিবারে ওঁর আপোষের কথা শুনেছি, দেখেছি অনেকটাই। তবে দেখা গুলোই শুধু ওঁকে চিনিয়ে দেয়না। কানাকড়ি হীন ভাবে চার ছেলেমেয়ে কে প্রায় একা নারী হয়েই উনি মানুষ করেছেন একটা কলোনি বাড়িতে, এটাই ওঁকে চিনিয়ে দেয় ।

মনে পড়ে, আমায় প্রথম ডিজিটাল ঘড়ি টা কিনে দিয়েছিল ঠাম্মাই। ওটা পড়ে ওই বয়েসে আমি সময় দেখতাম, যদিও সময়ের কিচ্ছু বুঝি না। আমাদের বাড়ি এলে মাঝে মাঝে ওঁর রাতের বিছানা পেতে দিতাম আমি, আদর পাওয়ার লোভে মাঝরাতে যখন মশারি তে ঢুকতাম, ঠাম্মা তখন আমায় টেনে নিত ছেড়া কাঁথার তলায়। আমি আদর খেয়ে আবার আমার জায়গায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লে, সকালে ঠাম্মাই আমায় বলত, আজকে একটু পড়ে নে সোনা.. তবে রাত্রে গল্প বলব। এই ভাবে অনেক গল্প শুনেছি ওঁর কাছে, প্রায় সব গল্পই ছিলো পুরাণের, দেবদেবী দের। এখন সব ভুলে গেছি, যেমন ঠাম্মার গলার আওয়াজ টাও এখন ঠিক মনে আনতে পারিনা। 
আমার অঙ্ক ভুলে যাওয়া টা ছিলো আজন্ম রোগ। মনে পড়ে প্রথম যেদিন অঙ্কে শূন্য পেয়ে ছিলাম মায়ের হাত থেকে ওই আমায় বাঁচিয়ে ছিলো। তারপর থেকে আজও আমি অঙ্ক পারিনা। আর কোনো দিন অঙ্ক পারিনি। ঠাম্মাও চলে গেছে, আমাকে, আমাদের বাঁচানোর আর এক জনও নেই। 

পাড়ার এক কোনের বট গাছটা যেমন একটা রিক্সা স্ট্যান্ড, মন্দির, পাশে পড়ে থাকা আবর্জনা কে এক করে রেখেছে। আমরা যার জন্যে আসা যাওয়ার পথে একবারও ওকে নিয়ে ভাবতে চাইনা, তেমনই ঠাম্মা নিজেই একটা বট গাছ ছিল। যার জন্যে আমরা এতো গুলো পরিবার এক হয়ে থাকতাম, মানিকতলা র বাড়ী টা জ্বলজ্বল করতো। আজ দশ বছর ঠাম্মা নেই, তবুও আমরা, আমাদের পরিবার গুলো বটের ঝুড়ি গুলোর সাথে আলগা হলেও লেগে আছে, মানিকতলা তে ওঁর না থাকা টা অনুভব করতেই যেন বারবার যেতে ইচ্ছা করে। আসলে ওঁর চলে যাওয়াটা আমার কাছে শুধু মাত্র একটা শহরের চলে যাওয়ারই মতো, যার চলে যাওয়ার পর সমস্ত সম্পর্ক-যোগাযোগ আলগা হয়ে যায়। প্রবাদের মতো আমরা একটা ছাওয়ায় বসে থাকি, যেখানে হাইরাইজ আর সি সি ডি গুলো স্মৃতির কবর খুড়ে আমাদের অপেক্ষা করছে।


ঋফন,
দোসরা শ্রাবণ, ১৪২৭ ।





Photo courtesy : Anit Mukerji



মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মৃত্যু বাই লেন

মৃত্যু আমার সমস্ত লেখাপড়া শব দেহ জুড়ে জ্বলে পুরনো ছাই পাত্র আমি আসলে কোথায় ছিলাম তাও জানিনা শুধু,  জানি কেবল ছুড়ে ফেলা ছুড়ে ফেলতে ফেলতে আজকে এখানে কালকে ওখানে অথবা তোমার দাওয়ায় এই আমি জ্বলতে জ্বলতেই মস্তিষ্কে তোমার পচন রোধের মলম নিয়ে, অপেক্ষায় মৃত্যু, আমার হাতে দুমুঠো চাল চাই.. চাল ছাড়া আর কিছু নেই তোমার মস্তিষ্কের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমি ক্লান্ত, ছুড়ে ফেলা দূরত্বে দাড়িয়ে ভাবছি.. তুমিও আমায় সরিয়ে দেবে, মৃত্যু, আমার দুমুঠো চাল চাই.. মৃত্যু আমার সমস্ত লেখাপড়া। উনিশে জুলাই ,২০২০

বিশ্বাস করে লেখা

তাকে চুপি চুপি ফেলে রেখে গেলি  মাঝে রাস্তায় পড়ে রইল অ্যালবাম, চিঠি দোতলার বারান্দা দিয়ে যাকে প্রতিদিন দেখতিস, ইতিউতি ঘুরে বেড়ায়  তাকেও দাঁড় করিয়ে রাখলি আদ্র তল্লাটে  ইচ্ছামতী আর সুবর্ণরেখার মাঝামাঝি  এখন তুই , ভরা গাঙ এখনো স্পর্শ করেনি কাছাকাছি কোন টিলায় বাঁধা রুকস্যাক এসব গল্পেরই এখনো বিশ্বাস করি  কোন আষাঢ়ে গল্প তৈরি করিনি বলে, বিশ্বাস রাখি- তোর ট্রেন লেট হবে না